আজ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সংগৃহীত ছবি

চমেক হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের আল্টিমেটাম


সরকারের কাছ থেকে ২২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা না পাওয়ায় ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে একযোগে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১৭ বা ১৮ অক্টোবরের পর যেকোনো মুহূর্তে এ সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও চমেক হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিসে দুটি সেন্টার স্থাপন করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর মেডিকেইডস (প্রা.) লিমিটেড। এর মধ্যে ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ৫৯টি এবং চমেক হাসপাতালে ৩১টি মেশিনে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া হচ্ছে। চমেক হাসপাতালের পূরনো (মূল) ভবনের নিচ তলায় (ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানের পাশে) এই ডায়ালাইসিস সেন্টারটি স্থাপন করা হয়। ২০১৭ সালে এই সেন্টারে ডায়ালাইসিস সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়। তবে সেবাদান বাবদ সরকারের কাছে ২২ কোটি টাকা পাওনা বকেয়া রয়েছে দাবি করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একযোগে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চমেক হাসপাতাল পরিচালক বরাবর গতকাল (১৫ অক্টোবর) দেয়া এক চিঠিতে এমন আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। স্যান্ডরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব সিন্ধীর স্বাক্ষরে প্রদত্ত চিঠিতে বলা হয়েছে- ২২ কোটির অধিক বকেয়া নিয়ে সেবাদান অব্যাহত রাখতে কোম্পানির সক্ষমতা নেই। অর্থাভাবে গত মাসে স্টাফদের বেতন দেয়া সম্ভব হয়নি। বিল পরিশোধ করতে না পারায় কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। চলতি মজুদে ১৭ বা ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সেবা দেয়া সম্ভব। এরপর যেকোনো মুহূর্তে সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে মর্মে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্যান্ডরের এ সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান। আর চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে সেটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পরিশোধ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বিল দাখিল করলে সেটি স্বাক্ষর করে ফরোয়ার্ড করে দেয়ার কাজটুকু আমরা করে থাকি। আমাদের কাছে সর্বশেষ যে বিল দাখিল করেছে, আমরা সেটিও পাঠিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ আমাদের এখানে কোনো জটিলতা নেই। তারা যা জানিয়েছে, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বিল আটকে থাকছে। বকেয়া পাওনা না পাওয়ায় এখন তাদের পক্ষে সেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে। আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো তেমন বিকল্প নেই। হাসপাতালে মাত্র ৬টি মেশিনে ডায়ালাইসিস সেবা চালু আছে। তাই তাদের সেবা বন্ধ থাকলে এখানকার রোগীরা ভোগান্তিতে পড়বে। আমরা বিষয়টি দ্রুততার সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তাদের চিঠি পাওয়া মাত্র সেটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।

জানতে চাইলে ডায়ালাইসিস সেবা চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর মেডিকেইডস (প্রা.) লিমিটেড-এর ম্যানেজার (হিসাব) নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, আমরা কোনোভাবেই সেবা বন্ধ রাখতে চাই না। আমরা চাই রোগীরা যাতে কোনোভাবে কষ্ট না পায়। কিন্তু সংকট অনেক দিন ধরে চলছে। ৫ বছর ধরে আমাদের আংশিক বিল পরিশোধ করলেও একটি অংশ বকেয়া রেখে দেয়া হয়েছে। এখন ২২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা আছি। এই বিপুল অংকের বকেয়া পাওনা না পাওয়ায় আমাদের হিমশিম অবস্থা। আমরা যে প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করি, তাদের বিল পরিশোধ করতে পারছি না। তারাও তো ব্যবসা করছে। তারাও এভাবে কতদিন পারবে। বেশি টাকা বকেয়া থাকায় সাপ্লাইয়াররা আমাদের আর প্রয়োজনীয় ওষুধ ও কাঁচামাল সরবরাহ করছে না। আর ওষুধ ও কাঁচামাল না পেলে ডায়ালাইসিস সেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব না। অর্থাৎ সেবা চালু রাখা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। এরপরও আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। আমরা চাই এর একটি সমাধান হোক। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আর তো কিছু করার থাকে না।

এর আগে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকেও দুটি সেন্টারে একযোগে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার পর আগের দিন (৪ জানুয়ারি) রাতেই ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে প্রতিষ্ঠানটি। স্যান্ডর কর্তৃপক্ষের দাবি- ওই দিন বৈঠকে এক সপ্তাহের মধ্যে বকেয়া পাওনা পরিশোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করে। সরকারের ওই আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু প্রায় এক মাসেও সরকারের কাছ থেকে বকেয়া পাওনা না পাওয়ায় ২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ রাখে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর।

অবশ্য, ওই সময় সেন্টারের প্রবেশপথে একটি নোটিশ সাঁটানো দেখা যায়। ৩১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত নোটিশে বকেয়া পাওনা না পাওয়ায় তহবিল সংকটে দুয়েক দিনের বেশি সেবা চালু রাখা সম্ভব হবেনা মর্মে উল্লেখ করা হয়। হঠাৎ ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ করায় দূর-দূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিডনি রোগী ও তাদের স্বজনরা দুর্ভোগে পড়েন। আগাম ঘোষণা ছাড়া সেবা বন্ধ রাখায় সেন্টারের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন তারা। যদিও প্রায় ৮ ঘণ্টা পর বিকেল চারটার দিকে পুনরায় সীমিত আকারে এ সেবা চালু করা হয়। কয়েক দিনের মাঝে বিল পরিশোধ করা হবে মর্মে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হলে পুনরায় সেবা চালু করে ডায়ালাইসিস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর মেডিকেইডস (প্রা.) লিমিটেড।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর